বগুড়ার খবরইতিহাস-ঐতিহ্য

বগুড়া: ইতিহাস, অবদান ও ন্যায্য মূল্যায়নের প্রশ্ন–প্রফেসর ড. মোহাঃ হাছানাত আলী

বগুড়াকে নিয়ে আলোচনা হলেই একটি বিষয় প্রায়ই চোখে পড়ে—এই জেলার উন্নয়ন, সম্ভাবনা কিংবা প্রশাসনিক মর্যাদার প্রশ্নে অযৌক্তিক বিরোধিতা। মতভেদ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, কিন্তু যখন সেই মতভেদ তথ্যের পরিবর্তে আবেগ, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা কিংবা বিদ্বেষ দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন তা জাতীয় উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক হয় না।
বগুড়া বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ষাটের দশক থেকেই এখানে শিল্পায়নের একটি শক্ত ভিত গড়ে ওঠে। গ্লাস ফ্যাক্টরি, আয়রন শিল্প, ম্যাচ ফ্যাক্টরি, কটন স্পিনিং মিল, তামাক শিল্প, সিরামিক কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাজমা সিরামিকের পণ্য একসময় আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি হতো। অর্থাৎ, শিল্প ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে বগুড়ার ঐতিহ্য কোনো সাম্প্রতিক অর্জন নয়; এটি দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতার ফল।
মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পেও বগুড়া ছিল উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, হেলাল প্রেস, মুকুল প্রেসসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সংবাদপত্র, সাহিত্যপত্র, ম্যাগাজিন ও বই প্রকাশিত হতো। গ্রীন বুক হাউসের “সামাদের গ্রামার” একসময় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে ইংরেজি ব্যাকরণের অন্যতম জনপ্রিয় গ্রন্থ ছিল। কিশোর লাইব্রেরির প্রকাশিত বইও বহু প্রজন্মের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে বগুড়ার অবদান তাই অনস্বীকার্য।
প্রযুক্তি গ্রহণেও বগুড়া উত্তরাঞ্চলে অগ্রগামী ছিল। ইন্টারনেট ও ই-মেইলের প্রাথমিক যুগে যখন অনেক বড় শহরেও সংবাদপত্রে ডিজিটালভাবে ছবি পাঠানোর সুযোগ সীমিত ছিল, তখন বগুড়া সেই প্রযুক্তিগত সুবিধা ব্যবহার করছিল। এটি কেবল অবকাঠামোগত সক্ষমতার নয়, বরং পরিবর্তনকে দ্রুত গ্রহণ করার মানসিকতারও প্রতিফলন।
যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বগুড়ার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে এই শহর দিন-রাত সচল থাকে। দেশের প্রায় সব অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বগুড়াকে একটি স্বাভাবিক আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাতমাথা মোড় শুধু একটি সড়কসংযোগ নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও মানুষের চলাচলের কেন্দ্রবিন্দু।
শিক্ষাক্ষেত্রেও বগুড়ার অবস্থান দীর্ঘদিনের। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের মেধাতালিকায় বগুড়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক সাফল্য এ জেলার শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের প্রমাণ। এখানকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নাগরিক সুবিধার কারণে বহু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থল বদলি হলেও তাঁদের পরিবারকে বগুড়াতেই স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য রেখে দেন। এটি কোনো প্রচারণা নয়; বরং একটি সামাজিক বাস্তবতা।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হলে বগুড়ার নাম স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। কারণ একটি বিভাগ গঠনের প্রশ্ন কেবল আবেগের নয়; এটি ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, অর্থনীতি, যোগাযোগ, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে। তাই কেউ যদি মনে করেন বগুড়া বিভাগ হওয়া উচিত নয়, তিনি অবশ্যই সেই মত প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু সেই মতের ভিত্তি হওয়া উচিত তথ্য ও যুক্তি, কোনো অঞ্চলের প্রতি অযাচিত বিরূপ মনোভাব নয়।
একটি জেলার উন্নয়ন অন্য জেলার উন্নয়নের প্রতিবন্ধক নয়। বরং ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়নই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম শর্ত। বগুড়ায় যদি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর, উন্নত শিল্পাঞ্চল বা আরও বড় প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে ওঠে, তবে তার সুফল কেবল বগুড়াবাসী নয়; সমগ্র উত্তরাঞ্চলের মানুষ ভোগ করবে।
আজ প্রয়োজন প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা; বিদ্বেষ নয়, বাস্তবতা; আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন। বগুড়াকে তার ঐতিহাসিক অবদান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শিক্ষাগত সাফল্য, যোগাযোগগত গুরুত্ব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা হোক। একটি অঞ্চলের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করা মানে অন্য অঞ্চলের অধিকার হরণ করা নয়; বরং সমগ্র বাংলাদেশের সুষম উন্নয়নের পথকে আরও সুদৃঢ় করা।

বগুড়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। ইতিহাস, শিল্প, শিক্ষা, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেরও নিজস্ব শক্তি ও অবদান রয়েছে।
তাই বগুড়াকে নিয়ে আলোচনায় আবেগ বা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে প্রয়োজন বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ। একটি অঞ্চলের ন্যায্য উন্নয়ন নিশ্চিত করা মানে অন্য অঞ্চলের অধিকার খর্ব করা নয়; বরং তা সমগ্র বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে।
বগুড়া তার ইতিহাস, অর্জন, সম্ভাবনা ও কৌশলগত গুরুত্বের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হোক। মতভেদ থাকুক, কিন্তু তা যেন তথ্যনির্ভর হয়; সমালোচনা থাকুক, কিন্তু তা যেন বিদ্বেষে নয়, যুক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই হবে একটি পরিণত জাতি ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রের পরিচয়।

প্রফেসর ড. মোহাঃ হাছানাত আলী
উপাচার্য
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button