
সাঘাটার তেনাছিড়া বিল যেন প্রকৃতির জীবন্ত জলরঙের ক্যানভাস

জয়নুল আবেদীন, সাঘাটা ,গাইবান্ধা

বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নের তেনাচিরা বিল। চারদিকে অথৈ জলরাশি, তার বুকজুড়ে সবুজ পদ্মপাতার বিস্তার, আর ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা গোলাপি পদ্মফুলÑসব মিলিয়ে যেন প্রকৃতি নিজ হাতে এঁকেছে এক জীবন্ত জলরঙের ক্যানভাস। এই অপরূপ সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত দর্শনার্থী।
প্রায় বৃত্তাকার আকৃতির বিস্তীর্ণ বিলটির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটি পাকা সড়ক। বর্ষায় সেই সড়কের একাংশ পানিতে তলিয়ে গেলে সৃষ্টি হয় এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। মনে হয়, জলরাশির বুক চিরে এগিয়ে গেছে একটি রহস্যময় পথ। সেই পথ ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতা আর চারপাশের শীতল বাতাস ভ্রমণপিপাসুদের কাছে হয়ে ওঠে অন্যরকম এক আনন্দের নাম। যেদিকে চোখ যায়, শুধু জল আর সবুজের মিতালি। দূরে গ্রামের ঘরবাড়ি, গাছপালা আর নীল আকাশের প্রতিচ্ছবি মিলে তৈরি করে এক মোহনীয় দৃশ্যপট। অনেকে এই বিলকে উত্তরাঞ্চলের ‘ছোট্ট সমুদ্র’ বলেও অভিহিত করেন। দর্শনার্থীদের কেউ ক্যামেরায় বন্দি করছেন প্রকৃতির রূপ, কেউ ব্যস্ত সেলফিতে, আবার কেউ নৌকায় ভেসে ঘুরে দেখছেন বিলের বিস্তৃতি। স্বচ্ছ পানিতে নেমে গোসল করে বর্ষার নির্মল আনন্দও উপভোগ করছেন অনেকে। পরিবার, বন্ধু কিংবা স্বজনদের নিয়ে সারাদিনই প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে থাকে বিলপাড়। দর্শনার্থীদের ভিড়ে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। নৌকা ভাড়া দিয়ে বাড়তি আয় করছেন স্থানীয় মাঝিরা। পাশাপাশি খাবারের দোকান ও অস্থায়ী ব্যবসায়ীরাও ভালো বেচাকেনা করছেন। গোবিন্দগঞ্জ থেকে ঘুরতে আসা আমিনুল ইসলাম বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেনাচিরা বিলের ছবি দেখে এসেছিলাম। বাস্তবে এসে সৌন্দর্য আরও বেশি মুগ্ধ করেছে। এমন জায়গা সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি।”
গাইবান্ধা সদর থেকে পরিবার নিয়ে আসা আফিয়া আক্তার বলেন, “প্রকৃতির খুব কাছাকাছি সময় কাটানোর জন্য এটি দারুণ একটি স্থান। তবে বসার জায়গা, শৌচাগার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও উন্নত করা হলে দর্শনার্থীরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।” স্থানীয় মাঝি লুৎফর রহমান বলেন, “বর্ষা মৌসুমে মানুষের ভিড় বাড়ে। নৌকা চালিয়ে কিছু বাড়তি আয় হয়। সরকারি উদ্যোগে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।”
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল কবীর বলেন, “তেনাচিরা বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়ে এর পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।” স্থানীয়দের বিশ্বাস, পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে তেনাচিরা বিল শুধু গাইবান্ধার নয়, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। বর্ষা এলেই তাই তেনাচিরা বিল শুধু জলেই ভরে ওঠে না, জেগে ওঠে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের স্বপ্ন আর সম্ভাবনার নতুন দুয়ারও।



