বগুড়ার খবর

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পারিবারিক ব‍্যবসার রাইস মিল বিক্রি ৪২ কোটি টাকায়, হলফনামায় ‘১৮২৪ শতাংশ জমি ও ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য’

স্টাফ রিপোর্টার

সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপির সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত প্রচারণাকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে তাঁর দাখিল করা হলফনামা ও পারিবারিক ব্যবসার বর্তমান অবস্থার বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর নামে ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ সম্পত্তি এবং ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) এড়াতে তিনি পারিবারিক ব্যবসার মালিকানা থেকে লিখিতভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন। এছাড়াও জাতীয় নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি পরিবারের মালিকানাধীন রোমা অটোরাইস মিল ৪২ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মীর পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী পরিবার হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্য, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।

নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ সম্পত্তি এবং ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য উল্লেখ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—রোমা অটো রাইস মিল, রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেড, রূপসী ফ্লাওয়ার মিল, মীর সীমান্ত-দিগন্ত ফিলিং স্টেশন, মীর লাবনী-সুনাত ফিলিং স্টেশন, মীর দিগন্ত ট্রেডিং এজেন্সি, উত্তর বাংলা ওভারসিজ লিমিটেড, রূপসী কৃষি খামার, রূপসী মৎস্য খামার, রূপসী কংক্রিট ব্রিকস ফ্যাক্টরি, রূপসী মিনি কোল্ড স্টোরেজ এবং রূপসী প্রাণী খামার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) এড়াতে মীর শাহে আলম পারিবারিক ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও ব্যবস্হাপনা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি নেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার, পরিচালনা ও সার্বিক মালিকানাসহ যাবতীয় দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে পারিবারিক ব্যবসা পরিবারের অন্যান্য সদস্যগন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যবসার পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে জাতীয় নির্বাচনের আগে ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে পরিবারের মালিকানাধীন রোমা অটোরাইস মিলটি ৪২ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিক্রয় কার্যক্রম নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। মিলটির ক্রেতা বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা এলাকার গণেশপুর গ্রামের রাইস মিল ব্যবসায়ী রবিউল আলম। রবিউল বলেন, আমি ২ ফেব্রুয়ারি-২০২৬ তারিখে ৪২ কোটি টাকায় মিলটি ক্রয় করেছি এবং মালামালসহ প্রতিষ্ঠানের সব দায়িত্ব বুঝে নিয়েছি।

এদিকে সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রতিমন্ত্রীর সম্পদ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, প্রতিবেদনে হলফনামার তথ্য আংশিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হলফনামায় ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ সম্পত্তি ও ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য থাকলেও প্রতিবেদনে মাত্র ৩১ শতাংশ সম্পত্তির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, যা সম্পদের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। সচেতন মহলের ধারনা, ভিন্নকোন উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে সুনাম ক্ষুন্ন করতে হলফনামায় উল্লেখিত সম্পদের প্রকৃত তথ্য উপস্হাপন করা হয়নি।

এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর নামে নতুন করে ২৪২ শতাংশ জমি ক্রয়ের যে দাবি করা হয়েছে, সেটিও সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, আলোচিত জমিটি ব্যক্তি হিসেবে মীর শাহে আলমের নামে নয়; বরং রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেডের নামে ক্রয় করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছেন। ফলে বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নামে কোনো ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত বা জমি ক্রয়ের প্রশ্নই আসে না। এ নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও অসত‍্য তথ‍্য প্রচার না করার অনুরোধ রইল।

শিবগঞ্জ উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, মীর শাহে আলম বহু বছর ধরেই এ অঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাঁর বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি ব্যবসার মালিকানা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে আমরা জানি। একটি মহল প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুন্ন করার জন্যই এমন অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছেন বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুর রউফ রুবেল বলেন, প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে আমার মনে হয়েছে, শিরোনামের সঙ্গে প্রতিবেদনের উপস্থাপিত তথ্যের যথেষ্ট সামঞ্জস্য ছিল না। চটকদার নেগেটিভ হেডিং থাকলেও নিউজের সারাংশে পূর্ণাঙ্গ কোন তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়নি।

সচেতন মহলের মতে, হলফনামার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পর্যালোচনা না করে এর আংশিক অংশ প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন জনপ্রতিনিধির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করা পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ভিত্তিতেই সংবাদ প্রকাশ করা উচিত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button