আমার জীবনের অন্যতম ছায়াবৃক্ষ ছিলেন লেঃ কর্নেল (অব:) জিল্লুর রহমান – আতাউর রহমান মিটন


বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জিল্লুর রহমান-এর মৃত্যু সংবাদ শুনে আমি স্তব্ধ হয়েছিলাম। মানুষ মরণশীল এই কথাটি তাঁর বেলায় প্রযোজ্য হবে বিষয়টি আমার মাথায় ছিলনা মনে হয়! একটি সামাজিক স্বেচ্ছাব্রতী সংগঠন সোনাতলা নাগরিক কমিটি তাঁর স্মরন সভার আয়োজন করে, আমিও আমন্ত্রিত ছিলাম। যদিও শেষ পর্যন্ত স্ব-শরীরে উপস্থিত থাকতে পারিনি। কিন্তু স্মরণ সভাকে কেন্দ্র করে তার বর্ণিল জীবনের কিছু স্মৃতি ভেসে ওঠে আমার চোখের সামনে। সেই স্মৃতির মধ্য দিয়েই স্মরণ সভায় যেন বলতে থাকি-
যে মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজকের এই আয়োজন তিনি আপনাদের প্রিয়জন কিন্তু আমার কাছে ছিলেন একজন অভিভাবক, একজন ছায়াবৃক্ষ। তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক পারিবারিক। আমার পিতা ও মরহুমের ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ ছিলেন শৈশবের বন্ধু। যতটুকু জানি আমার বাবা’র শৈশব ও যৌবনের দিনগুলো তাদের ফুলবাড়িয়ার বাড়িতেই কেটেছে। সেই সুবাদে আমি তাঁকে ডাকতাম ‘বড় আব্বা’। তাঁর চার সন্তানের (সীমা, সৌরভ, সোহেল, সোমা) সাথে আমার সম্পর্ক ছিল ভাইবোনের মতই। বিশেষ করে তাঁর ছোট ভাই, সোনাতলার রাজনীতিতে পরিচিত মুখ আমার প্রিয় ‘জাদু চাচা’ এখনও আমাকে অশেষ স্নেহ করেন।
তিনি কর্মজীবনে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও সুনামের সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের রক্ষায় নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি তিনি সমাজসেবাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফুলবাড়িয়া এইচ এমভি দাখিল মাদ্রাসা, মালতিনগর এসপি ব্রিজের পাশে অবস্থিত বগুড়া মহিলা কলেজসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান তাঁর অবদানের স্মারক হয়ে আছে। প্রকৃতির নিয়মে তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন। তবে তাঁর এই চলে যাওয়া দেশ ও সমাজের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে সোনাতলার অনেক মানুষ ও আমাদের পরিবার তাঁর কাছে ঋণী। আমি তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। মহান স্রষ্টা তাঁকে বেহেশত নসীব করুন। একই সাথে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। মহান আল্লাহ তাঁর পরিবার ও বন্ধু-স্বজন সকলকে এই কঠিন শোক সহ্য করার ধৈর্য দান করুন। আমিন।
কর্ণেল জিল্লুর কেবল সোনাতলার একজন কৃতিমান মানুষ ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। আমাদের সামনে তিনি ছিলেন এক ‘বাতিঘর’। জীবন গঠনে তাঁর পরম স্নেহ ও যৌক্তিক পরামর্শ আমাকে ও আমার পরিবারকে সবসময় সঠিক পথ দেখিয়েছে। আমি মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেছি শুনে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহৃত ‘ওয়াকম্যান’ (ব্যাটারীচালিত ছোট্ট ক্যাসেট প্লেয়ার) আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। সে সময় ‘ওয়াকম্যান’ সবার খুবই কাঙ্খিত একটি বস্তু ছিল। তিনি আমাকে পড়ালেখার ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দিতেন। আমার মায়ের হাতের রান্না তিনি খুব পছন্দ করতেন। আশির দশকে যখনই তিনি বগুড়া আসতেন অবশ্যই আমাদের বাড়িতে যেতেন এবং মার রান্না খেতেন। আমরা সবাই তাঁর এই আনন্দে আনন্দিত হতাম। আমরা সপরিবারে তাঁর সৈয়দপুর, ঢাকা সাভার সেনানীবাসস্থ বাসা এবং তদানীন্তন বিডিআর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বপালকালে ময়মনসিংহ ও ঢাকার বাসায় গিয়েছি, থেকেছি। তাঁর বাড়ির দরজা ছিল সকলের জন্য খোলা। দেখেছি বহু মানুষ নানা প্রয়োজনে তাঁর সাথে দেখা করতে ছুটে গেছেন এবং তিনি সকলকেই সাধ্যমত সহযোগিতা করেছেন। মানুষের সেবা করা, সামাজিক উন্নয়নে নেতৃত্ব দেওয়া এবং তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখানোই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রত। তাঁর স্নেহ, প্রজ্ঞা এবং দিকনির্দেশনা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে।
চাকুরীজীবন থেকে অবসর নেয়ার পরে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেছিলেন কিন্তু সফল ব্যবসায়ী ছিলেন বলে আমার মনে হয়নি। কারণ, মুনাফার চাইতে তাঁর মনযোগ ছিল পরার্থপরতায়, জনকল্যাণে। যদিও তাঁর ডানপন্থী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী’র সাথে আমার ব্যক্তিগত দ্বিমত ছিল। তবে আমি কখনই সেই দ্বিমত প্রকাশের সাহস দেখাইনি। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলার মত ধৃষ্টতা আমার বা আমার পরিবারের কখনই ছিল না।
তাঁকে নিয়ে আপনারা অনেকেই বলবেন। আমাদের স্মৃতিচারণ মূল্যবান। আমি শুধু একটি অনুরোধ করতে চাই, তা হলো আপনারা কর্ণেল জিল্লুরসহ সকল কীর্তিমানদের জীবন ও কর্মের দিকগুলো সংকলনের উদ্যোগ নিন। মনে রাখবেন, যে সমাজ গুণীদের সম্মান জানাতে ব্যর্থ হয় সেই সমাজে গুণীর জন্ম হয় না। প্রত্যেকে তাঁদের কর্মের দ্বারা মূল্যায়িত হবেন ইতিহাসের কষ্টি পাথরে। আমাদের দায়িত্ব হোক এই মানুষগুলোর জীবন ও কর্মগুলো সংকলিত করে রাখা।
সোনাতলার নাগরিক কমিটির এই আয়োজনে আমি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি আপনাদেরই একজন হিসেবে পুনরায় লেঃ কর্ণেল জিল্লুর রহমান এর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানাচ্ছি।

লেখক- প্রধান নির্বাহী, বিকশিত বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ও উপস্থাপক, মাটি ও মানুষ, বাংলাদেশ টেলিভিশন



