সারাদেশ

যমুনা তীর রক্ষা প্রকল্পে ধস, সাঘাটার জনপদভাঙনের মুখে: ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কায় পাউবোর ৭৯৮ কোটি টাকার মহাপ্রকল্প

জয়নুল আবেদীন, সাঘাটা(গাইবান্ধা) প্রতিনিধি

গাইবান্ধার সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন থেকে জনপদ রক্ষায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রায় ৭৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন স্থায়ী তীর সংরক্ষণ প্রকল্পে ধস দেখা দিয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পের প্যাকেজ-১০ এর আওতায় সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর এলাকায় নির্মিত পিচিংয়ের প্রায় একশ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় প্রকল্পের গুণগত মান, তদারকি ও বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফুলছড়ি উপজেলার কাতলামারী থেকে সাঘাটা উপজেলার গোবিন্দী ও হলদিয়া পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার যমুনা তীর রক্ষায় ৩৮টি প্যাকেজে কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও পরবর্তীতে ২০২৫ সালে পুনরায় রি-টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। শুরু থেকেই নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠলেও কার্যকর প্রতিকার মেলেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে হলদিয়া এলাকার প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, পিচিং করা সিসি ব্লকের একটি বড় অংশ ধসে নদীগর্ভে চলে গেছে। নদীর প্রবল স্রোত ও ভাঙনের কারণে ব্লকের নিচের মাটি সরে গিয়ে পিচিং ধসে পড়েছে। এতে নদীপাড়ের বসতভিটা, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
১০ নং প্যাকেজের স্থানীয় বিএনপি নেতা আবু বক্কর বলেন, নদীর তলদেশকে স্থিতিশীল করতে প্রয়োজনীয় ব্লক ডাম্পিং সম্পন্ন না করেই সিসি ব্লক পিচিং করা হয়েছে। এছাড়া পিচিংয়ের নিচে ব্যবহৃত জিওটেক্সটাইল ম্যাট, খোয়া ও বালুর ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নির্ধারিত মানের পরিবর্তে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণেই এ ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে তার দাবি।
স্থানীয় প্রকৌশলী রাশেদ খান বলেন, “নদীতে ব্লক ডাম্পিং করা হলে তলদেশ শক্তিশালী হয় এবং পিচিং সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু ডাম্পিং ছাড়া পিচিং করায় স্রোতের তোড়ে নিচের মাটি সরে গেছে। ফলে ব্লকগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্যাকেজ-১০ এর আরও কয়েকটি স্থান বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা হাশেম মিয়া বলেন, শুধু ১০ নম্বর প্যাজে নয়,পুরো প্রকল্পই নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে, “শুরু থেকেই কাজ নিয়ে নানা অভিযোগ শুনে আসছি। এখন নিজের চোখেই দেখছি ব্লক নদীতে চলে যাচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বাড়িঘর ও ফসলি জমি রক্ষা করা কঠিন হবে।”
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকেই নিম্নমানের কাজ ও অনিয়মের বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন।
এদিকে শত শত কোটি টাকার এই প্রকল্প এলাকায় কাজের বিবরণ, ব্যয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত তথ্যসম্বলিত কোনো সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ড দেখা যায়নি। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে তথ্যপ্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের তথ্য অনুপস্থিত থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভাঙন পরিস্থিতি পরিদর্শনে এসে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ব্লক ডাম্পিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য, হলদিয়া এলাকায় প্যাকেজ-১০ এর আওতায় ৩৭৫ মিটার নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। তবে কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই পিচিং ধসে পড়ার ঘটনায় পুরো ৭৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের স্থায়িত্ব, নির্মাণমান এবং সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ও সামগ্রিক কাজের গুণগত মান যাচাইয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button