ইকবাল কবির লেমন
বগুড়ার সোনাতলায় তরুণ নারী উদ্যোক্তা তাসলিমা আকতার লিমার 'লিমা’স ড্রিম এগ্রো' স্বপ্ন দেখাচ্ছে বিষমুক্ত কৃষি ও নারী কর্মসংস্থানের। ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনে লিমার সফলতায় উজ্জীবীত হচ্ছে কর্ম খুঁজে বেড়ানো বগুড়ার নারীরা। ২০০৮ সালে এসএসসি পাশের পর কৃষি ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নকালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সোনাতলা উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিন লাজু’র মেয়ে লিমা। কৃষি ডিপ্লোমা লাভ করে কর্মসংস্থানের নানা উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হন লিমা। চাকরি নামের সোনার হরিণের পিছনেও ছুটতে থাকেন অনেকটা সময়। এক সময় তাঁর মাথায় আসে শিক্ষাজীবনে অধ্যয়ন করা কৃষি বিশেষত, ভার্মি কম্পোস্ট সারের কথা। আবারও ভার্মি কম্পোস্ট নিয়ে শুরু করেন অধ্যয়ন, আলাপ-আলোচনা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে নেন প্রশিক্ষণ। এরপর ২০২২ সালে বগুড়া শহরতলীর মাটিডালি এলাকায় শুরু করেন নিজ নামে ভার্মি কম্পোস্ট প্রজেক্ট ‘লিমা’স ড্রিম এগ্রো’ ইউনিট-১। প্রথমে মাত্র ২/৩ জন নারীকে নিয়ে নিজেই সংগ্রহ করেন ৫ কেজি কেঁচো, প্রয়োজনীয় গোবর ও অন্যান্য উপাদান। সেই সময় দিনে নারী শ্রমিকদের সাথে কাজ করলেও লিমার যেন শ্রান্তি নেই। রাতেও দেখভাল করতেন ভার্মি কম্পোস্ট প্রজেক্ট। উদ্যোগ গ্রহণের ১০ থেকে ১৫ দিনের প্রচেষ্টায় সফল হন লিমা। উৎপাদন শুরু হয় পরিবেশবান্ধব ভার্মি কম্পোস্টের। বাজারজাত করতে প্রথমে বেশ বেগ পেতে হলেও পরবর্তীতে ‘এগ্রো ওয়ান’ নামক একটি কোম্পানীর সাথে ব্যবসায়িক চুক্তি হয় লিমার। কোম্পানীটি বর্তমানে লিমা’স ড্রিমের উৎপাদিত সকল জৈব সার কিনে বাজারজাত করছে। চাহিদার সাথে সাথে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রজেক্ট বর্ধিত করে বগুড়ার সোনাতলায় লিমা’স ড্রিম এগ্রো, ইউনিট-২ এর কার্যক্রম শুরু
করেন লিমা। বর্তমানে লিমা’স ড্রিম এগ্রো প্রতিমাসে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে ৬০ থেকে ৭০ মেট্রিক টন। 'লিমা’স ড্রিম এগ্রো'তে কর্মরত নারী রহিমা জানান, ‘বাড়ির পাশে 'লিমা’স ড্রিম এগ্রো'তে ভার্মি কম্পোস্ট প্রজেক্টে কাজ করে উপার্জন করতে সক্ষম হচ্ছি। আমার উপার্জিত টাকায় সন্তানদের লালন-পালন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে স্বামীকে সহায়তা করতে পাচ্ছি।’ ‘লিমা’স ড্রিম এগ্রো’র সিইও তাসলিমা আকতার লিমা জানান, ‘ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের মাধ্যমে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি ও উর্বর জমিতে খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিজেকে যুক্ত করতে পেরে আমি গর্বিত। আমি চাই একসময় রাসায়নিক সারের ব্যবহার বন্ধ হয়ে শুধু যেন প্রাকৃতিক সারের ব্যবহার বাড়ে। ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের মাধ্যমে বর্তমানে আমি যেমন স্বাবলম্বি হয়েছি, তেমনি কর্মসংস্থান দিতে পেরেছি কিছু নারীকে। আগামী দিনে কৃষিবিপ্লব ও নারীদের কর্মসংস্থান নিয়ে আমি আরও কাজ করতে চাই। সোনাতলা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ সোহরাব হোসেন বলেন, ‘ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করে কৃষির উন্নয়নে ব্যয় কমিয়ে ফলন ও উৎপাদন বাড়াতে এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো সম্ভব। এই কারণে কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদনের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে এ ক্ষেত্রে লিমা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। আমাদের দিক থেকে লিমাকে সম্ভব সব রকমের সহযোগিতা করা হবে। অন্য যে কেউ এই উদ্যোগ নিলে তার প্রতিও আমাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা থাকবে।’ লিমা’র মতো মেধাবী নারীদের হাত ধরে কৃষিতে বিপ্লব আসুক, রাসায়নিকের বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ত্বরান্বিত হোক, নারীরা স্বাবলম্বি হোক এবং বাংলাদেশ এগিয়ে যাক এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।