যমুনার ভাঙনের ক্ষত বুকে নিয়েই সাঘাটার গোলাপির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

জয়নুল আবেদীন,সাঘাটা (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি

যমুনা নদীর ভাঙন মানেই আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর সর্বস্ব হারানোর বেদনা। সেই নির্মম বাস্তবতার মধ্য দিয়েই জীবনসংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়েছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার চিনির পটল গ্রামের গৃহবধূ গোলাপি বেগম। নদীভাঙনে কয়েক দফায় বাড়িঘর ও আবাদি জমি হারিয়ে একসময় তিনি হয়ে পড়েন দিশেহারা। স্বামী ফজলুর রহমান, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে চার সদস্যের সংসারে তখন অভাব-অনটনই ছিল নিত্যসঙ্গী।
ভাঙনের পর বহু কষ্টে নদীর তীরে ছয় শতক জমি কিনে নতুন করে বসতি গড়েন গোলাপি। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও স্থায়ী আয়ের কোনো পথ ছিল না। ঠিক এমন সময় প্রায় এখন থেকে দশ মাস বোনারপাড়ার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার বাস্তবায়নে ” যমুনা নদীর তীরে বসবাসরত পরিবার গুলোর জন্য জলবায়ু-অভিযোজিত খাদ্য নিরাপত্তা,জীবন জীবিকায়ন ও দুর্যোগ প্রস্ততি (এস এফ এস এল ভি)২য় পর্যায় প্রকল্প ” এর আওতাভূক্ত দিগন্ত নারীদলের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন । জীবনসংগ্রামের কথা শুনে তাঁকে “জলবায়ু-অভিযোজিত ক্লাইমেট স্মার্ট মডেল বাড়ি”সহযোগীতার আওতায় নেওয়া হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন অধ্যায়।
প্রকল্পের আওতায় গোলাপির বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে একটি ভার্টিক্যাল গার্ডেন,পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য মডেল সবজি বাগানে ফলছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, পালং শাক, বতুয়া শাকসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজি। বাড়ির আঙিনার পাশাপশি বরগা নেওয়া জমিতেও এখন ফলছে শিশুরপুষ্টি ও ভিটামিন এর অভাব মেটানোর জন্য বারি-১৭ জাতের মিষ্টি আলু এছাড়াও তাঁকে দেওয়া হয়েছে মানসম্মত বীজ, দূর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলায় ঝুলন্তসবজি বাগান তৈরির উপকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ,নিরাপদ ফসল উৎপাদন এর জন্য কম্পোস্ট সার তৈরির কৌশল ও প্রয়োজনীয় উপকরণ যাতে স্বল্প খরচে ফসল উৎপাদন অব্যাহত রাখা যায়।
বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি মাথায় রেখে মাচা ও ঝুলন্ত পদ্ধতিতে সবজি চাষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে পানি বাড়লেও ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা কমে যায়। একই সঙ্গে উঁচু স্থানে ছাগল পালন ও হাঁসের খামার গড়ে তোলার জন্য পরামর্শ ও এক কালীন সহযোগীতা এবং আয়ের বিকল্প উৎস হিসেবে তাঁকে দেওয়া হয়েছে দশটি হাঁস ও একটি ছাগল। বর্তমানে হাঁসের ডিম বিক্রি এবং ছাগল পালনের মাধ্যমে সংসারে বাড়তি আয় যুক্ত হয়েছে।
নিয়মিত তদারকি ও পরামর্শে এখন গোলাপির উঠান যেন ছোট্ট এক সবুজ খামার। পরিবারের চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন তিনি। এতে সংসারে ফিরেছে স্বস্তি ও স্থিতিশীলতা।
গোলাপি বলেন, “নদী হামার সব কিছু ক্যাড়্যা নিছে কিন্তু এ্যাখন মনে হয় ,হামি ফির খাড়া হবার পাম। “উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বোনারপাড়া” আমাকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়েছে। নিজের হাতে ফলানো সবজি আর হাঁস-ছাগলই এখন ভরসা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাথমিক ভাবে এমসিসি বাংলাদেশের সহযোগীতায় নদীভাঙনকবলিত চরাঞ্চলের পিছিয়েপড়া প্রান্তিক ১ হাজার ৬০০ পরিবারকে প্রকল্পের আওতায় নেয়া হয়েছে। পরিবার গুলোর জীবনমান উন্নয়নে ক্ষুদ্র আকারের এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সঠিক প্রশিক্ষণ, উপকরণ ও নিয়মিত সহায়তা পেলে হতদরিদ্র পরিবারও স্বাবলম্বী হতে পারেÑগোলাপির জীবন তারই বাস্তব উদাহরণ।
যমুনার ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত জীবনেও জ্বলে উঠেছে আশার আলো। গোলাপির চোখে এখন নতুন স্বপ্নÑসংসারকে আরও স্থিতিশীল করা, সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং নিজের পায়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা।



